Sunday , December 17 2017
Breaking News
A huge collection of 3400+ free website templates JAR theme com WP themes and more at the biggest community-driven free web design site
Home / ইসলাম / ও মন রমযানের ওই রোযা

ও মন রমযানের ওই রোযা

দূর দিনের কথা। আমরা যখন ছোট ছিলাম, ধর্মীয় উৎসব পবিত্র শবে বরাত ছিল অন্য রকম এক নির্মল আনুষ্ঠানিকতা। সন্ধ্যায় আলো ফুপু একদল পোলাপান নিয়ে পুকুরে নামতেন গোসল করতে। কসকো সাবান মেখে আমরা গোসল করতাম। পুকুরে বেশি ঝাঁপাঝাঁপি করা যেত না, আলো ফুপু দৃঢ় স্বরে বলতেন-‘আর দপাদপি নয়। আজ পবিত্র রাত। গুনাহ হবে।’ আমরা আলো ফুপুর কথা আমলে নিয়ে চুপচাপ পুকুর ঘাট থেকে উঠে আসতাম।
তারপর সোজা মসজিদ বাড়ি। মুরুব্বিদের সাথে বিনম্র জিকিরে গলা মেলাতে উৎসাহি হয়ে উঠতাম। আসলে সবার মনে তখন একটাই উদ্দেশ্য ছিল- জিলাপী। নামায শেষে মোনাজাতের পর মসজিদের ভেতর আমাদের হাতে তুলে দেয়া হতো লোভনীয় আস্ত জিলাপী। আহা, সেই জিলাপীতে কি স্বাদ। পরাণ জুড়িয়ে যায়।
মধ্যরাতে মা মহা উল্লাস নিয়ে যখন চালের রুটি আর গরুর মাংশের পসরা সাজাতেন মেলামাইনের প্লেটে, তখন এক রোখা আবেস নিয়ে সেসব খাবারে নিজেকে পুরোপুরি সমর্পন করতে আমার বিলম্ব হতো না। যেন এ খাবারগুলি ছাড়া শবে বরাত পূর্ণ হতো না।
সেদিন চলে গেছে। আমি এখন পরিণত একজন। আলো ফুপু দূর গাঁয়ের গৃহবধূ। কতটা বছর শবে বরাতের সন্ধ্যায় পুকুরে নেমে কসকো সাবান মেখে গোসল করা হয় না। জীবন-জীবিকায় ব্যস্ত বলে।
অনেক দিনের কাঙ্খিত শবে বরাতে এখন গোসল করি রাত দশটা কি সাড়ে দশটায়। পুকুরে নেমে নয়, সময়ের আবর্তিত বাথরুমে। কোথায় সেই কসকো সাবান! তার বদলে আমেরিকান স্প্রিং সাবান। কোথায় আমার সেই আলো ফুপু! আর কোথায়ও বা সেসব একদল পোলাপান!
তবুও শবে বরাত আসে পবিত্রতার রাত নিয়ে। জিলাপীর সেই লোভ এখন আর নেই। প্রজন্মের এই কৈশোরি চিল্লাচিল্লিতে শুনতে পাই আমার সেই একখানা জিলাপীর লালিত আকুতি।
বিভিন্ন কারণে এখন আর পবিত্র রাতে জিকিরে যোগদানও হয় না। মসজিদ যখন ক্রমে ক্রমে লোকশূন্য হতে শুরু করে, তখন মসজিদমুখি হই। নফল আদায়ের লক্ষ্যে ঘনিয়ে আসে মধ্যরাত। দীর্ঘ মোনাজাতে তুলে উঠে দু হাত। তারপর বাসায় ফিরলে আসে চালের রুটির সাথে মাংশের উৎসব।
২.
তার কিছুদিন পর আসে পবিত্র রমযান। সিয়াম সাধনার মাস। সারা দিনমান নিজেকে পবিত্র রাখার এক নিগুঢ় আবেস। কৈশোরের রমযান এখনো মনে পড়ে। দাদী আর মা মিলে সকালে কোরআন পাঠে সুর তুলতেন চিরচেনা গলায়। বেলা পড়লে রসই ঘরে জমে উঠত রন্ধন কার্যের এলাহী কান্ড। রকমারি ইফতার প্রস্তুতে মায়ের দক্ষ হাত হয়ে উঠত কর্মঠ। মাগরিবের বেলায় অদূরে মসজিদের মাইক থেকে সাইরেনের শব্দ ভেসে এলে মা ইফতার করার তাগিদ দিতেন। মহা উল্লাসে আমরা ইফতারে শামিল হয়ে একটি রোযার সার্থকতা বজায় রাখতাম। এভাবে ত্রিশ রোযা চলে যেত।
শেষ রাতে সেহেরি খেতে মা কিংবা দাদীর দরাজ কন্ঠস্বরের তাগিদে ঘুমকেতুর চোখে বিছানা ছেড়ে উঠতাম। নতুন করে আরেকটি রোযার পূর্ণতা লাভে শুরু হতো আরেকটা দিন।
জীবনেই এই বেলায় আজ আরেকটি রুপ নিয়ে আমার প্রতিটি রমযান আসে। যেহেতু এখন আমি কৈশোরের সেই ডানপিটে বা সুবোধ বালকটি নই, সারা শরীরে কর্মজীবি এক যোদ্ধা, এখনকার রোযার দিনগুলো সেই আগের মত থাকলেও বদলে গেছে ধারা, পরিবেশ অথবা সময়ের বিবর্তন। আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বিগত কয়েক বছর ধরে ইফতারের সময়টা কাটে। শেষ বিকেলে টিফিন বক্সে করে বাড়ি থেকে ইফতারের নানান উপকরণ পাঠানো হয়। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে আমিই সেগুলির আয়োজন করি।
অথচ এক সময় মা যখন সন্ধ্যালগ্নে ইফতারের আয়োজন করতেন, আমার উৎসুক দুটি চোখ সে দৃশ্য দেখতো মায়ের খুব নিকটে বসে। আর এখন আমিই ইফতারের আয়োজন করি, বাবা তার প্রবীণ দুটি চোখে আমার সে ইফতার আয়োজনের আনুষাঙ্গিক দৃশ্য দেখেন। বাবার হাতে তখন দোলে তসবীহ আর মাথায় সাদা টুপি। উপরের সিলিং ফ্যানের তীব্র হাওয়া তলে বসে আমি রেডি করি ইফতার। কিছুক্ষণ পর যে মুয়াজ্জিনের প্রবল কণ্ঠস্বর জেগে উঠবে হৃদয় নিংড়ানো পবিত্র আযানের সুরে।
সৃষ্টির মহাকালের মত পবিত্র রমযান মাস হয়ে উঠুক শান্তিময়।

Check Also

১৬ টি কুফরি বাক্য যা আমরা নিয়মিত বলে থাকি

১. আল্লাহর সাথে হিল্লাও লাগে। ২. তোর মুখে ফুল চন্দন পড়ুক। ( ফুল চন্দন হিন্দুদের …

Leave a Reply

Your email address will not be published.